গাজিপুর এর কালিয়াকৈর থানায় ফকির কেশা পাগলার মাজার ।ফকির কেশা গাঁজা খেতেন কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে কেউ বলেনি এখনো।
তপস্যার চার পথ-- স্থূল, পর্বত, ছাতক ও সিদ্ধি। গুরুর নামে যখন গাঁজা খাওয়া হয়, তখন সেটা সিদ্ধি আর এমনি এমনি খেলে তা নেশা করা, পাগলামি। জানান, রাজবাড়ি থানার বরাট থেকে কেসা পাগলার স্মরণোৎসবে যোগ দেয়া রবি পাগল।
সিদ্ধিতে লম্বা টান দিলেন রবি পাগল। বললেন, সিদ্ধি হচ্ছে আত্মার খোরাক। দেহের ভেতর আত্মা রাজা। সে খায় গাঁজা। যে গুরুর তরিকত করে সিদ্ধি খায়, সিদ্ধি সেবা করে সে। গুরুর নামে খেলে এটা সিদ্ধি, নাইলে গাঁজা।কেসা পাগলার গাঁজা খাওয়া বেশ সাধারণ ব্যাপার। তবে সকলেই গাঁজা খায় না। কেসা পাগলার ভক্তদের একটি তরিকার লোকই গাঁজায় অভ্যস্ত। সাধকদের খুব কম জনকেই তামাক ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এমন সাধু সন্নাসী রয়েছেন যারা তামাকের গন্ধও সহ্য করতে পারেন না। এসব পছন্দও করেন না।
তবে কেসাপাগলার আখড়া এলাকায় স্মরণোৎসবের এই সময়টায় এখন গাঁজার গন্ধ ছাড়া এতটুকু জায়গা পাওয়া দুস্কর। তবে এখানে গাঁজা বিক্রি হয় না, ভক্তদের ছোট ছোট আসরে বসে খেয়ে যেতে হয়।সম্মুখে বিক্রি না হলে ও প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ টাকার মাদক বিক্রি হয় এখানে ।
কেসা অনুসারীদের মধ্যে সাধু ও বাউলদের মধ্যে গাঁজার ব্যবহার কম থাকলেও, চিশতিয়া তরিকতের যে পাগল দল রয়েছে এরা সকলেই গাঁজার ভক্ত।
পাগলদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এরা সকলেই লাল কাপড় ব্যবহার করেন। বড় দাড়ি, অনেকের জটা চুল, ময়লা শরীর, গলায় পাথর ঝোলানো, বড় মালা ইত্যাদি। হাতে থাকে লাঠি বা এমন কিছু, যেটা দৈব শক্তি প্রকাশ করে।
তপস্যার সঙ্গে গাঁজার সম্পর্ক নিয়ে কথা হয়, আবু সাঈদ চিশতিয়া, ওমর ফারুক পাগল ও রবি পাগলের সঙ্গে। জানালেন, গাঁজা খাওয়ার জন্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কলকি। এগুলোকে বলা হয় বাঁশি। রয়েছে, কৃষ্ণ বাঁশি, নাগিনী বাঁশি, শঙ্খ বাঁশি, বিচ্চু বাঁশি, গণেশ বাঁশি, মেগনেট বাঁশি ও সাধারন বাঁশি। কারুকার্য, বানানোর নিপুণতার দিক দিয়ে বাঁশির দাম ১০টাকা থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত হয় বলে জানালেন তারা। তবে সবচেয়ে বেশি চলে কৃষ্ণ বাঁশিই। দেশের সবচেয়ে ভাল বাশি বানানো হয় বগুড়া এবং টাঙ্গাইলে।

বাংলাদেশে গাঁজার তামাকের মধ্যেও রয়েছে পার্থক্য। কুষ্টিয়ার তামাক বেশ ভাল। রংপুর, বগুড়া, ঝিনাইদহের তামাকও ভালো মানের। তবে ঢাকায় যে তামাক পাওয়া যায়, সেগুলোতে বেশিরভাগই ভেজাল থাকে বলে জানান এই পাগল ভক্তরা। দেশের বাইরের পাকিস্তানের তামাকের বেশ নাম রয়েছে। এছাড়াও নেপালের একটি তামাক রয়েছে যা শীতকালে খেতে বেশ ভাল হয়।
আবু সাঈদের তরিকতের টাইটেল ‘চিশতিয়া’। বর্তমানে ব্রা²ণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে থাকেন বৌ ছেলে নিয়ে। ১৪ বছর বয়সে জন্মস্থান রংপুর ছাড়ার পর আর যাওয়া হয়নি।
কেসা ভক্তির সঙ্গে গাঁজার সম্পর্ক কী জানেন না এই পাগল। বলেন, কেসা যেমন পাগল, মন নিয়ে খেলাধুলা করেছেন, আমরাও খেলি। নিজেদের নিয়ে, ভব নিয়ে। লালনের সঙ্গে প্রেম করি। প্রেমে মত্ম, প্রেমের পাগল।
ছোট বেলা থেকেই সৃষ্টি আর স্রষ্টা নিয়ে ভাব জাগে সাঈদ চিশতিয়ার মনে। সত্যের সন্ধান খুঁজতে থাকে মন। ¯^প্নে দেখা মেলে গুরু অবয়বের। ১৩ বছর বয়সে ভারতের কনিয়াম্বরীতে গেলে দেখা মেলে সে গুরুর। হযরত সাবির পীর আলাউদ্দিন। গুরুর সামনে যেয়ে তওবা করে মুরিদ হই তার। বয়স বাড়লে দেশে আসি।
সাঈদ চিশতিয়া জানালেন, পাগলদের তরিকত আছে ৪টি। খাজা মঈনউদ্দিন ওরফে চিশতিয়া, বড় পীর সাব ওরফে কাদেরিয়া, হযরত শাহজালাল ওরফে নকশাবন্দি এবং বোয়ালিকান্দার ওরফে মোজাদ্দিয়া। এ চার তরিকতের পাগলদের মধ্যে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। তবে সব পাগলই ভাই ভাই।
সাঈদ বললেন, এখন কিছু শয়তান আছে যারা পাগল না, ভান ধইরা থাকে, টাউটারি করে। আমরা দেখলে বুঝে যাই। এরা আমাদের সামনে আসে না।গাঁজার সঙ্গে তপস্যার সর্ম্পকের ব্যাপারে মনা পাগল আরো বলেন, ভজে জয় গুরু পাগলচাঁদ/ অদ্বৈত মহাপ্রভু/ শক্তি মাথা ভারতি/ মাথা বিদায় গমনে/ গুরু ভ্রম্যচারী সিদ্ধোস্তী/ ভ্রম্য বিশ্ব মহেশ্বর/ শিবলিঙ্গু কৃষ্ণকালি/ ঈশ্বর মহাপ্রভু, চরণে ভক্তি করলাম/ ধরায় অধ্যন্ত সিধান্তু/ পাগল অদ্বৈত সিধান্ত/ পাগলচান অদ্বৈত/ রুপাটে শ্রী-পটে...
তিনি বলেন, ধর্ম হলো সত্য, মিথ্যা হলো পাপ। মানুষের কিছিম দু’টা। হুঁশ আর বেঁহুশ। বেহুঁশরে বন্দেগিরিতে সাধন ভোজন, প্রার্থণা নাই, আরাধনা নাই। এসব বেহুঁশ খরচ করে ভোজন করুক না কেন, কোন মজুরি পাবে না। যার হুঁশ আছে তার সব আছে, ধর্ম আছে। যে সিদ্ধি সেবা করে সে হুঁশে আছে।
পাগল দৈব শক্তির ভক্ত। শক্তিতে ভক্তি, সিদ্ধিতে মুক্তি।
বললেন, লাইনও আছে ৪টি, হকিকত, তরিকত, মারেফত আর শরিয়ত। আমরা তরিকতে আছি।
১৬/১৭ বছর বয়স থেকেই ব্রক্ষচারী মনা পাগল। কার ঘরে জন্ম নিয়েছেন তিনি জানেন না। ছোট বেলায় মা ডাস্টবিনে ফেলে যায়। পরে সেখান থেকে রাজবাড়ী নিয়ে যায় এক বুড়ি। তাকে নানী বলেই ডাকত।
বলেন, বাঁচার কথা ছিল না। সারা শরীরে পুঁজ হইছিল। জন্মের সময় নানী যখন নাকি পাইছিল, সব অঙ্গও ছিল না আমার। এতো কষ্টের পরও ঈশ্বর আমারে বাচায়া তুলে।
ছোট কাল থেকেই ঈশ্বর খোঁজার চিন্তা আসে। কে বানাইছে চন্দ্র, সূর্য। ১২ ঘণ্টা পরপর পরিবর্তন হয়।
নদীর পাড়ে মহিলারা বাসন কোসন ধুতে যেয়ে এঁটো পানি ফেলত। একদিন এক পাগল এসে সে পানি খাচ্ছিল। ভাত খুইটা খুইটা খাচ্ছিল। সকলে অবাক হয়। আমি হই না। মনে হইছিল অন্য কোনো দেশের লোক উনি। আমার মতো না। কিন্তু ঈশ্বরের কোন ছাপ আমি তার মুখে পাই না।
বয়স যখন ১৬ বা ১৭ বছর। সেদিন দেশে হ্যাঁ/না ভোট হচ্ছিল। আমি তখন নয়াপাড়া স্টেশনে, ২ বন্ধু আইসা বলল, তমালতলায় এক পাগল আছে চল। গেলাম, তানারে দেইখ্যা মনে হইল সারা পৃথিবী উনার মুখের মধ্যে। মনে হলো উনিই গুণিগুরু, দয়াল মুর্শিদ।
নিজে নিজে বলে উঠলেন মনা পাগল, ভক্তই আমার মাতা/ ভক্তই আমার পিতা/ ভক্তই আমার নাম রেখেছে কল্প তরুলতা...
সেই প্রথম সিদ্ধি সেবন করেন রবি । এরপর থেকেই পাগল অদ্বৈত সিদ্ধান্ত কৃষ্ণ করিম বালা’র মুরিদ হয়ে যান মনা। এ গুরুই মনাকে জানিয়েছেন লালণ ভক্তির কথা।
মনা পাগল বলেন, আমার গুরুই আমাকে দিয়েছে লালন।
আত্মাকে খুঁজে পেতে সুবিধা হয় সিদ্ধি সেবনে। বলেন, নিজের দেহের ভেতর রয়েছে ৬টি আত্মা। ভূত আত্মা, পেত্নী আত্মা, জীব আত্মা, পরমাত্মা, দেবাত্মা এবং আত্মা অমেশ্বর। নিজের আত্মা খুঁজে পেতে হবে। আরো রয়েছে ১০টি ইন্দ্র আর ৬টি রিপু। এগুলোর কোনটার কি খাসরত (¯^ভাব) সেটিও জানতে হবে। জানতে হবে দৈব শক্তি, চিনতে হবে সত্য পথ।
পাগলের তাঁবুর পেছন থেকে গেয়ে ওঠেন বাউল—
তিন পাগলে হলো মেলা
ন’দে এসে
তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে।
ব্যাখা করেন পাবনার বাউল মোতালেব শাহ্ ফকির। বলেন, লোভ, দ্বেষ, মোহ হলো তিন পাগল। আর এই তিন পাগলের সহাবস্থানেই দেহে সৃষ্টি সংস্কার। অস্তিত্বের আকার নিভিয়ে দেয়ার জন্য এই তিন পাগল সর্বদাই ব্যস্ত। সাঁইজি লালন তাই এই অজ্ঞানী, অধ্যানী ও বিকার দেহ মনের পাগলদের নিকট না যাওয়ার জন্য সাবধান করেছেন। আল্লাহ্ জাগ্রত হচ্ছে না আর অবিকল জাতের সাথে একাকার না হওয়ায় তৈরি হচ্ছে অজাত, বেজাত। পাগলের ¯^ভাব, আচরণ ও ব্যবহার সম্পূর্ন আসক্তির মধ্যে বন্দি। তাই সবার আগে ইন্দ্রীয় দ্বার দিয়েই খালি বা শুন্য করতে হবে দেহ মনের সংস্কার। তবেই মিলবে আপন ঈশ্বর, ভগবান বা আল্লাহ্কে।
পাগলদের ব্যাপারে তিনি বলেন, পাগল হচ্ছে তিন ধরনের, বায়ুর পাগল, ভবের পাগল আর ভাবের পাগল।

No comments:
Post a Comment